• Menu
    • সরকারি সেবা সমূহ
    • লেখাপড়া আইন আদালত ট্যুরিজম টিউটোরিয়াল চাকরির বাজার ডাউনলোড অনলাইন টুল্স মোবাইল টিপ্স
    • বেসরকারী দাপ্তরিক কাজ
    • কম্পিউটার ট্রাবলশুটিং সরকারি সেবা সমূহ সাহিত্য আসর মোবাইলের দাম যাচাই লেপটপের দাম যাচাই DSLR ক্যামেরা LED TV অন্যান্য ইলেক্ট্রনিক্স
    • নিত্য প্রয়োজনীয়
    • স্বাস্থ্য কণিকা অডিও ডাউনলোড ভিডিও ডাউনলোড সফটওয়্যার ডাউনলোড ইমেজ ভেকটর DSLR ক্যামেরা LED TV অন্যান্য ইলেক্ট্রনিক্স
    • অন্যান্য দাপ্তরিক সাইট
    • সরকারি সেবা সমূহ সাহিত্য আসর মোবাইলের দাম যাচাই লেপটপের দাম যাচাই DSLR ক্যামেরা LED TV অন্যান্য ইলেক্ট্রনিক্স
রবিন্দ্রনাথের কবিতা

পুরস্কার

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

সেদিন বরষা ঝরঝর ঝরে,

    কহিল কবির স্ত্রী —

‘ রাশি রাশি মিল করিয়াছ জড়ো,

রচিতেছ বসি পুঁথি বড়ো বড়ো,

মাথার উপরে বাড়ি পড়ো-পড়ো

    তার খোঁজ রাখ কি!

গাঁথিছ ছন্দ দীর্ঘ হ্রস্ব —

মাথা ও মুণ্ড, ছাই ও ভস্ম ;

মিলিবে কি তাহে হস্তী অশ্ব,

    না মিলে শস্যকণা।

অন্ন জোটে না, কথা জোটে মেলা,

নিশিদিন ধরে এ কী ছেলেখেলা!

ভারতীরে ছাড়ি ধরো এইবেলা

      লক্ষ্মীর উপাসনা

ওগো ফেলে দাও পুঁথি ও লেখনী,

যা করিতে হয় করহ এখনি।

এত শিখিয়াছ, এটুকু শেখ নি

    কিসে কড়ি আসে দুটো! '

দেখি সে মুরতি সর্বনাশিয়া

কবির পরান উঠিল ত্রাসিয়া,

পরিহাসছলে ঈষৎ হাসিয়া

    কহে জুড়ি করপুট —

‘ ভয় নাহি করি ও মুখ-নাড়ারে,

লক্ষ্মী সদয় লক্ষ্মীছাড়ারে,

ঘরেতে আছেন নাইকো ভাঁড়ারে

    এ কথা শুনিবে কে বা!

আমার কপালে বিপরীত ফল,

চপলা লক্ষ্মী মোরে অচপল,  

   ভারতী না থাকে থির এক পল

       এত করি তাঁর সেবা॥

তাই তো কপাটে লাগাইয়া খিল

স্বর্গে মর্ত্যে খুঁজিতেছি মিল,

আনমনা যদি হই এক তিল

       অমনি সর্বনাশ। '

মনে মনে হাসি মুখ করি ভার

কহে কবিজায়া, ‘ পারি নেকো আর,

ঘর-সংসার গেল ছারেখার,

       সব তাতে পরিহাস। '

এতেক বলিয়া বাঁকায়ে মুখানি

শিঞ্জিত করি কাঁকন দুখানি

চঞ্চল করে অঞ্চল টানি

       রোষছলে যায় চলি।

হেরি সে ভুবন-গরব-দমন

অভিমানবেগে অধীর গমন,

উচাটন কবি কহিল, ‘ অমন

       যেয়ো না হৃদয় দলি।

ধরা নাহি দিলে ধরিব দু-পায়

কী করিতে হবে বলো সে উপায়,

ঘর ভরি দিব সোনায় রুপায় —

       বুদ্ধি জোগাও তুমি।

এতটুকু ফাঁকা যেখানে যা পাই

তোমার মুরতি সেখানে চাপাই,

বুদ্ধির চাষ কোনোখানে নাই —

            সমস্ত মরুভূমি। '

‘ হয়েছে, হয়েছে, এত ভালো নয় '

হাসিয়া রুষিয়া গৃহিণী ভনয়,

‘ যেমন বিনয় তেমনি প্রণয়

আমার কপালগুণে।

  কথার কখনো ঘটে নি অভাব,

যখনি বলেছি পেয়েছি জবাব ;

একবার ওগো বাক্য-নবাব,

         চলো দেখি কথা শুনে।

শুভ দিনখন দেখো পাঁজি খুলি,

সঙ্গে করিয়া লহো পুঁথিগুলি,

ক্ষণিকের তরে আলস্য ভুলি

        চলো রাজসভামাঝে।

আমাদের রাজা গুণীর পালক,

মানুষ হইয়া গেল কত লোক —

ঘরে তুমি জমা করিলে শোলোক

         লাগিবে কিসের কাজে! '

কবির মাথায় ভাঙি পড়ে বাজ ;

ভাবিল, বিপদ দেখিতেছি আজ,

কখনো জানি নে রাজা-মহারাজ —

         কপালে কী জানি আছে! '

মুখে হেসে বলে, ‘ এই বৈ নয়!

আমি বলি আরো কী করিতে হয় —

প্রাণ দিতে পারি, শুধু জাগে ভয়

         বিধবা হইবে পাছে।

যেতে যদি হয় দেরিতে কী কাজ,

ত্বরা করে তবে নিয়ে এসো সাজ —

হেমকুণ্ডল, মণিময় তাজ,

         কেয়ূর, কনকহার।

বলে দাও মোর সারথিরে ডেকে

ঘোড়া বেছে নেয় ভালো ভালো দেখে,

কিংকরগণ সাথে যাবে কে কে

         আয়োজন করো তার। '

ব্রাহ্মণী কহে, ‘ মুখাগ্রে যার

বাধে না কিছুই, কী চাহে সে আর,

মুখ ছুটাইলে রথাশ্বে আর

         না দেখি আবশ্যক।

নানা বেশভূষা হীরা রুপা সোনা

এনেছি পাড়ার করি উপাসনা —

সাজ করে লও পুরায়ে বাসনা,

         রসনা ক্ষান্ত হোক। '

এতেক বলিয়া ত্বরিতচরণ

আনে বেশবাস নানান-ধরন ;

কবি ভাবে মুখ করি বিবরন,

      ‘ আজিকে গতিক মন্দ। '

গৃহিণী স্বয়ং নিকটে বসিয়া

তুলিল তাহারে মাজিয়া ঘষিয়া,

আপনার হাতে যতনে কষিয়া

         পরাইল কটিবন্ধ।

উষ্ণীষ আনি মাথায় চড়ায়,

কণ্ঠী আনিয়া কণ্ঠে জড়ায়,

অঙ্গদ দুটি বাহুতে পরায়,

         কুণ্ডল দেয় কানে।

অঙ্গে যতই চাপায় রতন

কবি বসি থাকে ছবির মতন,

প্রেয়সীর নিজ হাতের যতন

         সেও আজি হার মানে।

এই মতে দুই প্রহর ধরিয়া

বেশভূষা সব সমাধা করিয়া

গৃহিণী নিরখে ঈষৎ সরিয়া

         বাঁকায়ে মধুর গ্রীবা।

হেরিয়া কবির গম্ভীর মুখ

হৃদয়ে উপজে মহাকৌতুক —

হাসি উঠি কহে ধরিয়া চিবুক,

‘ আ মরি সেজেছ কিবা! '  

  ধরিল সমুখে আরশি আনিয়া,

কহিল বচন অমিয় ছানিয়া,

‘ পুরনারীদের পরান হানিয়া

         ফিরিয়া আসিবে আজি —

তখন দাসীরে ভুলো না গরবে,

এই উপকার মনে রেখো তবে,

মোরেও এমনি পরাইতে হবে

         রতনভূষণরাজি। '

কোলের উপরে বসি ', বাহুপাশে

বাঁধিয়া কবিরে সোহাগে সহাসে

কপোল রাখিয়া কপোলের পাশে

         কানে কানে কথা কয়।

দেখিতে দেখিতে কবির অধরে

হাসিরাশি আর কিছুতে না ধরে,

মুগ্ধ হৃদয় গলিয়া আদরে

         ফাটিয়া বাহির হয়।

কহে উচ্ছ্বসি, ‘ কিছু না মানিব,

এমনি মধুর শ্লোক বাখানিব,

রাজভাণ্ডার টানিয়া আনিব

         ও রাঙা চরণতলে। '

বলিতে বলিতে বুক উঠে ফুলি,

উষ্ণীষ-পরা মস্তক তুলি

পথে বাহিরায় গৃহদ্বার খুলি —

         দ্রুত রাজগৃহে চলে।

কবির রমণী কুতূহলে ভাসে,

তাড়াতাড়ি উঠি বাতায়নপাশে

উঁকি মারি চায়, মনে মনে হাসে,

         কালো চোখে আলো নাচে।

কহে মনে মনে বিপুল পুলকে,

‘ রাজপথ দিয়ে চলে এত লোকে

  এমনটি আর পড়িল না চোখে

         আমার যেমন আছে। '

এদিকে কবির উৎসাহ ক্রমে

নিমেষে নিমেষে আসিতেছে কমে,

যখন পশিল নৃপ-আশ্রমে

         মরিতে পাইলে বাঁচে।

রাজসভাসদ্‌ সৈন্য পাহারা

গৃহিণীর মতো নহে তো তাহারা,

সারি সারি দাড়ি করে দিশাহারা —

         হেথা কি আসিতে আছে!

হেসে ভালোবেসে দুটো কথা কয়

রাজসভাগৃহ হেন ঠাঁই নয়,

মন্ত্রী হইতে দ্বারীমহাশয়

         সবে গম্ভীর মুখ।

মানুষে কেন যে মানুষের প্রতি

ধরি আছে হেন যমের মুরতি,

তাই ভাবি কবি না পায় ফুরতি

         দমি যায় তার বুক।

বসি মহারাজ মহেন্দ্ররায়

মহোচ্চ গিরি-শিখরের প্রায়,

জন-অরণ্য হেরিছে হেলায়

         অচল-অটল-ছবি।

কৃপানির্ঝর পড়িছে ঝরিয়া

শত শত দেশ সরস করিয়া,

সে মহামহিমা নয়ন ভরিয়া

         চাহিয়া দেখিল কবি।

বিচার সমাধা হল যবে, শেষে

ইঙ্গিত পেয়ে মন্ত্রী-আদেশে

  জোড়করপুটে দাঁড়াইল এসে

         দেশের প্রধান চর।

অতি সাধুমত আকারপ্রকার,

এক তিল নাহি মুখের বিকার,

ব্যবসা যে তাঁর মানুষশিকার

         নাহি জানে কোনো নর।

ব্রত নানামত সতত পালয়ে,

এক কানাকড়ি মূল্য না লয়ে

ধর্মোপদেশ আলয়ে আলয়ে

         বিতরিছে যাকে তাকে।

চোরা কটাক্ষ চক্ষে ঠিকরে —

কী ঘটিছে কার, কে কোথা কী করে,

পাতায় পাতায় শিকড়ে শিকড়ে

         সন্ধান তার রাখে।

নামাবলী গায়ে বৈষ্ণবরূপে

যখন সে আসি প্রণমিল ভূপে,

মন্ত্রী রাজারে অতি চুপে চুপে

         কী করিল নিবেদন।

অমনি আদেশ হইল রাজার,

‘ দেহো এঁরে টাকা পঞ্চ হাজার। '

‘ সাধু সাধু ' কহে সভার মাঝার

         যত সভাসদজন।

পুলক প্রকাশে সবার গাত্রে,

‘ এ-যে দান ইহা যোগ্য পাত্রে,

দেশের আবালবনিতা-মাত্রে

         ইথে না মানিবে দ্বেষ। '

সাধু নুয়ে পড়ে নম্রতাভরে,

দেখি সভাজন ' আহা আহা ' করে,

মন্ত্রীর শুধু জাগিল অধরে

ঈষৎ হাস্যলেশ।

  আসে গুটি গুটি বৈয়াকরণ

ধূলি-ভরা দুটি লইয়া চরণ

চিহ্নিত করি রাজাস্তরণ

       পবিত্র পদপঙ্কে।

ললাটে বিন্দু বিন্দু ঘর্ম,

বলি-অঙ্কিত শিথিল চর্ম,

প্রখরমূর্তি অগ্নিশর্ম,

       ছাত্র মরে আতঙ্কে।

কোনো দিকে কোনো লক্ষ না ক ' রে

পড়ি গেল শ্লোক বিকট হাঁ ক ' রে,

মটর-কড়াই মিশায়ে কাঁকরে

       চিবাইল যেন দাঁতে।

কেহ তার নাহি বুঝে আগুপিছু,

সবে বসি থাকে মাথা করি নিচু ;

রাজা বলে, ‘ এঁরে দক্ষিণা কিছু

       দাও দক্ষিণ হাতে। '

তার পরে এল গনৎকার,

গণনায় রাজা চমৎকার,

টাকা ঝন্‌ ঝন্‌ ঝনৎকার

       বাজায়ে সে গেল চলি।

আসে এক বুড়া গণ্যমান্য

করপুটে লয়ে দূর্বাধান্য

রাজা তাঁর প্রতি অতি বদান্য

       ভরিয়া দিলেন থলি।

আসে নটভাট রাজপুরোহিত

কেহ একা কেহ শিষ্য-সহিত,

কারো বা মাথায় পাগড়ি লোহিত

        কারো বা হরিৎবর্ণ।

আসে দ্বিজগণ পরমারাধ্য —

কন্যার দায়, পিতার শ্রাদ্ধ —

  যার যথামত পায় বরাদ্দ,

       রাজা আজি দাতাকর্ণ।

যে যাহার সবে যায় স্বভবনে,

কবি কী করিবে ভাবে মনে মনে,

রাজা দেখে তারে সভাগৃহকোণে

       বিপন্নমুখছবি।

কহে ভূপ, ‘ হোথা বসিয়া কে ওই

এসো তো মন্ত্রী, সন্ধান লই। '

কবি কহি উঠে, ‘ আমি কেহ নই,

       আমি শুধু এক কবি। '

রাজা কহে, ‘ বটে! এসো এসো তবে,

আজিকে কাব্য-আলোচনা হবে। '

বসাইলা কাছে মহাগৌরবে

       ধরি তার কর দুটি।

মন্ত্রী ভাবিল, ‘ যাই এইবেলা,

এখন তো শুরু হবে ছেলেখেলা। '

কহে, ‘ মহারাজ, কাজ আছে মেলা,

        আদেশ পাইলে উঠি। '

রাজা শুধু মৃদু নাড়িলা হস্ত,

নৃপ-ইঙ্গিতে মহা তটস্থ

বাহির হইয়া গেল সমস্ত

       সভাস্থ দলবল —

পাত্র মিত্র অমাত্য আদি,

অর্থী প্রার্থী বাদী প্রতিবাদী,

উচ্চ তুচ্ছ বিবিধ উপাধি

       বন্যার যেন জল।

চলি গেল যবে সভ্যসুজন,

মুখোমুখি করি বসিলা দুজন,

রাজা বলে, ‘ এবে কাব্যকূজন

          আরম্ভ করো কবি। '

কবি তবে দুই কর জুড়ি বুকে

বাণীবন্দনা করে নতমুখে,

‘ প্রকাশো, জননী, নয়নসমুখে

           প্রসন্ন মুখছবি

বিমল মানসসরসবাসিনী,

শুক্লবসনা শুভ্রহাসিনী,

বীণাগঞ্জিত মঞ্জুভাষিণী

       কমলকুঞ্জাসনা,

তোমারে হৃদয়ে করিয়া আসীন

সুখে গৃহকোণে ধনমানহীন

খ্যাপার মতন আছি চিরদিন

           উদাসীন আনমনা।

চারি দিকে সবে বাঁটিয়া দুনিয়া

আপন অংশ নিতেছে গুনিয়া —

আমি তব স্নেহবচন শুনিয়া

       পেয়েছি স্বরগসুধা।

সেই মোর ভালো, সেই বহু মানি —

তবু মাঝে মাঝে কেঁদে ওঠে প্রাণী,

সুরের খাদ্যে জান তো মা বাণী,

       নরের মিটে না ক্ষুধা।

যা হবার হবে, সে কথা ভাবি না,

মা গো, একবার ঝংকারো বীণা,

ধরহ রাগিণী বিশ্বপ্লাবিনা

       অমৃত-উৎস-ধারা।

যে রাগিণী শুনি নিশিদিনমান

বিপুল হর্ষে দ্রব ভগবান

মলিন মর্ত-মাঝে বহমান

নিয়ত আত্মহারা।

যে রাগিণী সদা গগন ছাপিয়া

হোমশিখাসম উঠিছে কাঁপিয়া,

অনাদি অসীমে পড়িছে ঝাঁপিয়া,

           বিশ্বতন্ত্রী হতে।

যে রাগিণী চির-জন্ম ধরিয়া

চিত্তকুহরে উঠে কুহরিয়া,

অশ্রুহাসিতে জীবন ভরিয়া,

       ছুটে সহস্র স্রোতে।

কে আছে কোথায়, কে আসে কে যায়,

নিমেষে প্রকাশে, নিমেষে মিলায় —

বালুকার ‘ পরে কালের বেলায়

       ছায়া-আলোকের খেলা!

জগতের যত রাজা-মহারাজ

কাল ছিল যারা কোথা তারা আজ,

সকালে ফুটিছে সুখদুখলাজ —

       টুটিছে সন্ধ্যাবেলা।

শুধু তার মাঝে ধ্বনিতেছে সুর

বিপুল বৃহৎ গভীর মধুর —

চিরদিন তাহে আছে ভরপুর

       মগন গগনতল।

যে জন শুনেছে সে অনাদি ধ্বনি

ভাসায়ে দিয়েছে হৃদয়তরণী ;

জানে না আপনা, জানে না ধরণী,

       সংসার-কোলাহল।

সে জন পাগল, পরান বিকল —

ভবকূল হতে ছিঁড়িয়া শিকল

কেমনে এসেছে ছাড়িয়া সকল

       ঠেকেছে চরণে তব।

তোমার অমলকমলগন্ধ

হৃদয়ে ঢালিছে মহা-আনন্দ — '

অপূর্ব গীত, আলোক ছন্দ

         শুনিছ নিত্য নব।

বাজুক সে বীণা, মজুক ধরণী,

বারেকের তরে ভুলাও জননী,

কে বড়ো কে ছোটো, কে দীন কে ধনী,

         কেবা আগে কেবা পিছে —

কার জয় হল কার পরাজয়,

কাহার বৃদ্ধি কার হল ক্ষয়,

কেবা ভালো আর কেবা ভালো নয়,

         কে উপরে কেবা নীচে।

গাঁথা হয়ে যাক এক গীতরবে

ছোটো জগতের ছোটোবড়ো সবে,

সুখে প ' ড়ে রবে পদপল্লবে

         যেন মালা একখানি।

তুমি মানসের মাঝখানে আসি

দাঁড়াও মধুর মুরতি বিকাশি,

কুন্দবরন সুন্দরহাসি

         বীণাহাতে বীণাপাণি।

ভাসিয়া চলিবে রবিশশীতারা

সারি সারি যত মানবের ধারা

অনাদিকালের পান্থ যাহারা

         তব সংগীতস্রোতে।

দেখিতে   পাইব ব্যোমে মহাকাল

ছন্দে ছন্দে বাজাইছে তাল,

দশ দিক্‌বধূ খুলি কেশজাল

         নাচে দশ দিক হতে। '

এতেক বলিয়া ক্ষণপরে কবি

করুণ কথায় প্রকাশিল ছবি

পুণ্যকাহিনী রঘুকুলরবি

রাঘবের ইতিহাস —

অসহ দুঃখ সহি নিরবধি

কেমনে জনম গিয়েছে দগধি,

জীবনের শেষ দিবস অবধি

       অসীম নিরাশ্বাস।

কহিল, ‘ বারেক ভাবি দেখো মনে

সেই এক দিন কেটেছে কেমনে

যেদিন মলিন বাকল-বসনে

       চলিলা বনের পথে —

ভাই লক্ষ্মণ বয়স নবীন,

ম্লানছায়াসম বিষাদ-বিলীন

নববধূ সীতা আভরণহীন

       উঠিলা বিদায়-রথে।

রাজপুরীমাঝে উঠে হাহাকার,

প্রজা কাঁদিতেছে পথে সারে সার —

এমন বজ্র কখনো কি আর

       পড়েছে এমন ঘরে!

অভিষেক হবে, উৎসবে তার

আনন্দময় ছিল চারি ধার

মঙ্গলদীপ নিবিয়া আঁধার

       শুধু নিমেষের ঝড়ে।

আর-একদিন, ভেবে দেখো মনে,

যেদিন শ্রীরাম লয়ে লক্ষ্মণে

ফিরিয়া নিভৃত কুটির-ভবনে

       দেখিলা জানকী নাহি —

‘ জানকী জানকী ' আর্ত রোদনে

ডাকিয়া ফিরিলা কাননে কাননে,

মহা-অরণ্য আঁধার-আননে

       রহিল নীরবে চাহি।

তার পরে দেখো শেষ কোথা এর,

ভেবে দেখো কথা সেই দিবসের —

এত বিষাদের   এত বিরহের

         এত সাধনের ধন,

সেই সীতাদেবী রাজসভামাঝে

বিদায়-বিনয়ে নমি রঘুরাজে

দ্বিধা ধরাতলে অভিমানে লাজে

        হইলা অদর্শন।

সে-সকল দিন সেও চলে যায় ;

সে অসহ শোক, চিহ্ন কোথায়-

যায় নি তো এঁকে ধরণীর গায়

         অসীম দগ্ধরেখা।

দ্বিধা ধরাভূমি জুড়েছে আবার,

দণ্ডকবনে ফুটে ফুলভার,

সরযূর কূলে দুলে তৃণসার

         প্রফুল্ল শ্যামলেখা।

শুধু সে দিনের একখানি সুর

চিরদিন ধ ' রে বহু বহু দূর

কাঁদিয়া হৃদয় করিছে বিধুর

         মধুর করুণ তানে ;

সে মহাপ্রাণের মাঝখানটিতে

যে মহারাগিণী আছিল ধ্বনিতে

আজিও সে গীত মহাসংগীতে

         বাজে মানবের কানে। '

তার পরে কবি কহিল সে কথা,

কুরুপাণ্ডব-সমর বারতা —

‘ গৃহবিবাদের ঘোর মত্ততা

         ব্যাপিল সর্ব দেশ ;

দুইটি যমজ তরু পাশাপাশি,

ঘর্ষণে জ্বলে হুতাশনরাশি,

মহাদাবানল ফেলে শেষে গ্রাসি

         অরণ্য-পরিবেশ।

এক গিরি হতে দুই স্রোত-পারা

দুইটি শীর্ণ বিদ্বেষধারা

সরীসৃপগতি মিলিল তাহারা

         নিষ্ঠুর অভিমানে —

দেখিতে দেখিতে হল উপনীত

ভারতের যত ক্ষত্র-শোণিত —

ত্রাসিত ধরণী করিল ধ্বনিত

         প্রলয়বন্যা-গানে।

দেখিতে দেখিতে ডুবে গেল কূল,

আত্ম ও পর হয়ে গেল ভুল,

গৃহবন্ধন করি নির্মূল

         ছুটিল রক্তধারা ;

ফেনায়ে উঠিল মরণাম্বুধি,

বিশ্ব রহিল নিশ্বাস রুধি,

কাঁপিল গগন শত আঁখি মুদি

         নিবায়ে সূর্যতারা।

সমরবন্যা যবে অবসান

সোনার ভারত বিপুল শ্মশান,

রাজগৃহ যত ভূতলশয়ান

         পড়ে আছে ঠাঁই ঠাঁই —

ভীষণা শান্তি রক্তনয়নে

বসিয়া শোণিত-পঙ্কশয়নে,

চাহি ধরাপানে আনত বয়নে

         মুখেতে বচন নাই।

বহুদিন পরে ঘুচিয়াছে খেদ,

মরণে মিটেছে সব বিচ্ছেদ,

সমাধা যজ্ঞ মহা নরমেধ

         বিদ্বেষ-হুতাশনে।

সকল কামনা করিয়া পূর্ণ

সকল দম্ভ করিয়া চূর্ণ

পাঁচ ভাই গিয়া বসিলা শূন্য

         স্বর্ণসিংহাসনে।

স্তব্ধ প্রাসাদ বিষাদ-আঁধার,

শ্মশান হইতে আসে হাহাকার —

রাজপুরবধূ যত অনাথার

         মর্মবিদার রব।

‘ জয় জয় জয় পাণ্ডুতনয় '

সারি সারি দ্বারী দাঁড়াইয়া কয় ;

পরিহাস ব ' লে আজি মনে হয়,

         মিছে মনে হয় সব।

কালি যে ভারত সারাদিন ধরি

অট্ট গরজে অম্বর ভরি

রাজার রক্তে খেলেছিল হোরি

         ছাড়ি কুলভয়লাজে,

পরদিনে চিতাভস্ম মাখিয়া

সন্ন্যাসীবেশে অঙ্গ ঢাকিয়া

বসি একাকিনী শোকার্তহিয়া

         শূন্য শ্মশানমাঝে।

কুরুপাণ্ডব মুছে গেছে সব,

সে রণরঙ্গ হয়েছে নীরব,

সে চিতাবহ্নি অতি ভৈরব

         ভস্মও নাহি তার ;

যে ভূমি লইয়া এত হানাহানি

সে আজি কাহার তাহাও না জানি —

কোথা ছিল রাজা, কোথা রাজধানী

          চিহ্ন নাহিকো আর।

তবু কোথা হতে আসিছে সে স্বর —

যেন সে অমর সমর-সাগর

গ্রহণ করেছে নব কলেবর

         একটি বিরাট গানে ;

অন্যান্য কবিদের তালিকা
কবিতা পড়তে ক্লিক করুন
বিদ্রোহী কবি কাজ নজরুল বিশ্ব কবি রবিন্দ্রনাথ ঠাকুর পল্লী কবি জসিম উদ্দীন যোগীন্দ্রনাথ সরকার সুফিয়া কামাল সুকুমার রায় শামসুর রাহমান যতীন্দ্রমোহন বাগচী সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত সুকান্ত ভট্টাচার্য নির্মলেন্দু গুণ মাইকেল মধুসূদন দত্ত আনিসুল হক শক্তি চট্টোপাধ্যায় জীবনানন্দ দাশ মহাদেব সাহা বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় রুদ্র মুহম্মদ শহীদুল্লাহ সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় আলাউদ্দিন আল আজাদ হুমায়ুন আজাদ মলয় রায়চৌধুরী মুহম্মদ জাফর ইকবাল নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী হুমায়ূন আহমেদ রফিক আজাদ রোকনুজ্জামান খান সৈয়দ শামসুল হক

Pages

  • টিউটোরিয়াল
  • ট্যুরিজম
  • আইন আদালত
  • লেখাপড়া
  • ডাউনলোড
  • অনলাইন টুল্স
  • মোবাইল টিপ্স
  • কম্পিউটার ট্রাবল শুটিং

User section

  • Login
  • Regiter

Top categories

অন্যান্য
  • সরকারি সেবা সমূহ
  • সাহিত্য আসর
  • Accessories
দাম যাচাই
  • মোবাইল
  • লেপটপ
  • DSLR ক্যামেরা
  • LED TV
  • অন্যান্য ইলেক্ট্রনিক্স পণ্য

Where to find us

প্রিন্ট মিডিয়া
২ মক্কা শপিং সেন্টার,
লিংকরোড
কক্সবাজার
বাংলাদেশ

Go to contact page

Get the news

Pellentesque habitant morbi tristique senectus et netus et malesuada fames ac turpis egestas.


Stay in touch

©2019 All resrved by Printmedia

design by Abdur Roup Azad

Free Web Hosting